কবিতা: “অচিন-হৃদয়”
যে পাখি উড়তে চায়, তাকে উড়তে দাও!
কেন তাকে অচিন খাঁচায় ভরে রাখতে চাও?
যে ফুল ফুটতে চায়, তাকে ফুটতে দাও!
কেন তাকে বুক পকেটে গুজে রাখতে চাও?
যে ঢেউ ভেসে যেতে চায়, তাকে যেতে দাও!
কেন তাকে একাকী তীরে বেঁধে রাখতে চাও?
যে সূর্য ডুবতে চায়, তাকে ডুবতে দাও!
কেন তাকে চোখের গহিনে বন্দী রাখতে চাও?
যে চাঁদ উঠতে চায়, তাকে উঠতে দাও!
কেন তাকে অবেলা আঁকড়ে ধরে রাখতে চাও?
যে বাতি নিভতে চায়, তাকে নিভতে দাও!
কেন তাকে অশ্রু-ভেজা পত্রের মুখে রাখতে চাও?
যে পাতা ঝরতে চায়, তাকে ঝরতে দাও!
কেন তাকে গাছের গায়ে ফেলে রাখতে চাও?
যে বাতাস চলতে চায়, তাকে চলতে দাও!
কেন তাকে রুক্ষ দেহ-প্রাণে জড়িয়ে রাখতে চাও?
যে মেঘ পড়তে চায়, তাকে পড়তে দাও!
কেন তাকে নির্জন আকাশে আটকে রাখতে চাও?
যে বই শেষ হতে চায়, তাকে শেষ হতে দাও!
কেন তাকে ঠোঁটের কিনারে জমিয়ে রাখতে চাও?
যে ভোর নির্যাস ছড়াতে চায়, তাকে ছড়াতে দাও!
কেন তাকে মনের মহিমায় জ্বালিয়ে রাখতে চাও?
যে পথ বাঁক নিতে চায়, তাকে বাঁক নিতে দেও!
কেন তাকে জগতের ওপারে বিছিয়ে রাখতে চাও?
যে তরুলতা দুলতে চায়, তাকে দুলতে দাও!
কেন তাকে মাটির বুক চিড়ে ফেলে রাখতে চাও?
যে বৃক্ষ বাড়তে চায়, তাকে বাড়তে দাও!
কেন তাকে কুঠারের কথায় কেটে রাখতে চাও?
যে আত্মা স্বপ্ন ছোঁতে চায়, তাকে স্বপ্ন ছোঁতে দাও!
কেন তাকে সাদাকালো সাহসে নির্জীব রাখতে চাও?
যে শীত বিদায় নিতে চায়, তাকে বিদায় দাও!
কেন তাকে বসন্তের খাতায় লিখে রাখতে চাও?
যে কালি ফুরাতে চায়, তাকে ফুরাতে দাও!
কেন তাকে ধূসর কাব্যরসে ডুবিয়ে রাখতে চাও?
যে সুর গর্জন করতে চায়, তাকে গর্জাতে দাও!
কেন তাকে ঠোঁটের পরশে শান্ত রাখতে চাও?
যে প্রকৃতি বর্ণহীন হতে চায়, তাকে বর্ণহীন হতে দাও!
কেন তাকে সৌন্দর্যের বেড়াজালে বাধ্য রাখতে চাও?
যে হাত ছুটে যেতে চায়, তাকে ছুটতে দাও!
কেন তাকে অন্তর দিয়ে অত্যাচারিত রাখতে চাও?
যে চোখ ভুলতে চায়, তাকে ভুলতে দাও!
কেন তাকে জর্জরিত মনের প্রাচীরে রাখতে চাও?
যে মায়া অদৃশ্য হতে চায়, তাকে আড়াল হতে দাও!
কেন তাকে আপন করে আঁধার-মনে রাখতে চাও?
যে হৃদয় ভাঙতে চায় তোমারই, তাকে থামিয়ে দাও!
জীবন-ভুবনের শত মরিচীকা ত্যাগ করে—
—সে হৃদয় নিজের করে নাও।
সারমর্মঃ
কবিতাটিতে প্রকৃতির স্বাভাবিক গতিধারা, জীবনের অনিবার্য পরিবর্তন এবং মানুষের ক্ষণস্থায়ী সম্পর্কের গভীর বাস্তবতাকে অত্যন্ত প্রতীকধর্মী ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে। পাখির উড়ে যাওয়া, ফুলের ফোটা, ঢেউয়ের বয়ে চলা, সূর্যের অস্ত যাওয়া, পাতার ঝরে পড়া কিংবা বাতাসের প্রবাহ—প্রতিটি দৃশ্যই একটি চিরন্তন সত্যের প্রতীক। সৃষ্টির প্রতিটি বস্তুরই একটি নির্ধারিত সময়, গন্তব্য ও পরিণতি রয়েছে। তাই যে চলে যেতে চায়, তাকে চিরদিন ধরে রাখা যায় না; যে পরিবর্তন আল্লাহ তা‘আলা তাঁর তাকদীর ও ফয়সালায় নির্ধারণ করেছেন, তা মানুষের ইচ্ছা বা শক্তি দ্বারা প্রতিহত করা সম্ভব নয়, যদি না আল্লাহ নিজেই তা পরিবর্তনের উপায় সৃষ্টি করেন। পৃথিবীর নিয়মই হলো পরিবর্তন, বিচ্ছেদ ও প্রস্থান; আর এ সত্য মেনে নেওয়াই প্রজ্ঞার পরিচয়।
দুনিয়ার কোনো মানুষ, কোনো সম্পর্ক কিংবা কোনো প্রাপ্তিই চিরস্থায়ী নয়। মানুষ আসে, কিছু স্মৃতি রেখে যায়, আবার একসময় বিদায় নেয়। কখনো মৃত্যু, কখনো সময়, কখনো দূরত্ব, আবার কখনো পরিস্থিতি মানুষকে আলাদা করে দেয়। এ বিচ্ছেদ যতই বেদনাদায়ক হোক না কেন, তা জীবনেরই স্বাভাবিক বিধান। তাই ক্ষণস্থায়ী জগতের প্রতি অতিরিক্ত আসক্ত না হয়ে আল্লাহর ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্ট থাকা এবং সবকিছুকে তাঁর তাকদীরের অংশ হিসেবে গ্রহণ করাই একজন মু’মিনের সৌন্দর্য।
তবে কবিতার সবচেয়ে গভীর উপলব্ধি নিহিত রয়েছে শেষাংশে। পৃথিবীর মানুষ একে একে দূরে সরে যেতে পারে, প্রিয়জন ভুলে যেতে পারে, সম্পর্ক ভেঙে যেতে পারে; কিন্তু এক নীরব সাথী শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত মানুষের সাথে চলতে থাকে—আর তা হলো তার নিজের হৃদয়। অর্থাৎ, পৃথিবীর সকল সঙ্গী একসময় দূরে সরে যেতে পারে; তবে জীবিত থাকা পর্যন্ত নিজের অন্তরই মানুষের সুখ-দুঃখ, ঈমান, আশা-হতাশা ও তাওবার সবচেয়ে নিকটতম সাক্ষী হয়ে থাকে। সেই হৃদয়েই জমা থাকে সব ভালোবাসা, সব ক্ষত, সব কান্না, সব হতাশা, সব আশা এবং রবের দিকে ফিরে আসার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। তাই অন্যের জন্য নিজের হৃদয়কে ভেঙে ফেলা, নিজের আত্মাকে হারিয়ে ফেলা কিংবা নিজের রব থেকে দূরে সরে যাওয়া কখনো প্রজ্ঞার কাজ নয়।
কবিতাটি তাই আত্মমর্যাদা, আত্মউপলব্ধি এবং আল্লাহমুখী জীবনের এক নীরব আহ্বান। মানুষকে নয়, সর্বাগ্রে নিজের অন্তরকে সংশোধন করতে হবে; কারণ পরিশুদ্ধ হৃদয়ই আল্লাহর নিকট সর্বাধিক মূল্যবান। জীবনের ক্ষণস্থায়ী মোহ, মানুষের প্রশংসা কিংবা সম্পর্কের অস্থিরতার চেয়ে অনেক বড় সত্য হলো—একদিন প্রত্যেক মানুষকেই মহান আল্লাহর কাছেই ফিরে যেতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
“প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। অতঃপর আমার নিকট তোমাদেরকে ফিরিয়ে আনা হবে।” ~(সূরা আল-আনকাবূত: আয়াত ৫৭)
সুতরাং নিজের হৃদয়কে মানুষের মায়া-প্রশংসার জন্য নয়, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য গড়ে তোলা, নিজের চরিত্রকে তাক্বওয়া, ইখলাস ও গা’য়রতে অলংকৃত করা এবং সব হারিয়েও রবের সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রাখা—এটাই একজন মু’মিনের প্রকৃত সাফল্য।
অতএব, কবিতাটি কেবল বিচ্ছেদের বেদনার কাব্য নয়; বরং এটি দুনিয়ার অনিত্যতা উপলব্ধি করে আত্মাকে আল্লাহমুখী করার, আল্লাহ প্রদত্ত মর্যাদা ও আত্মসম্মান অক্ষুণ্ণ রাখার এবং জীবনের প্রতিটি পরিবর্তনকে রবের ফয়সালা ও হিকমতের অংশ হিসেবে গ্রহণ করার এক গভীর জীবনদর্শনের কাব্যিক প্রকাশ।
“নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহরই, এবং আমরা তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তনকারী।” ~(সূরা আল-বাক্বারাহ: আয়াত ১৫৬)