হিরো To জিরো To হিরো
প্রথমে কোনো অশ্লীল/হারাম কিছু দেখলে আমাদের মন বা নফসে খারাপ অনুভূতি জাগে। কিন্তু যদি তা বারবার দেখা হয়, ধীরে ধীরে সেই খারাপ অনুভূতি হারিয়ে যায়, এবং তা স্বাভাবিক মনে হতে শুরু করে।
উদাহরণস্বরূপ, আপনি কোনো নেক আমল/কুর‘আন তিলাওয়াত করে বা নামায পড়ে এসে ফেসবুক/ইনস্টাগ্রাম/ইউটিউব/টিকটক বা যেকোনো সোশ্যাল মিডিয়ায় স্ক্রল করছেন—হঠাৎ ফিডে কোনো গা‘য়রে মাহরাম নারীর ছবি/ভিডিও, গান-বাজনা কিবা ফিতনাময় হারাম যেকোনো কিছু ভেসে এলো। প্রথমবার আপনি তা এড়িয়ে গেলেন! এরপর যখন আবার দেখলেন, একটু সময় নিয়ে দেখলেন। তৃতীয়বার এলে তা আর খারাপ লাগলো না। এই ধাপে আপনার তাকওয়া(আল্লাহভীতি) কমে গেলো এবং একটু একটু করে জমিয়ে রাখা চক্ষু-হেফাযত, গা‘য়রত ও ফিতরাত পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেলো। এভাবেই ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র পাপ আমাদেরকে ভয়ংকর পাপের দিকে ধাবিত করে। কোর‘আনে এসেছেঃ
“অতঃপর তাদের অন্তর কঠিন হয়ে গেল—পাথরের মতো, বরং তার চেয়েও কঠিন।” (আল-বাক্বারা: আয়াত ৭৪)
যখন নফসের দাসত্ব শুরু হয়—তখন হারাম গান-বাজনা, অশ্লীল ছবি বা ভিডিও দেখা নফসের কাছে স্বাভাবিক হয়ে যায়। একসময় মানুষ আরও ভয়ংকর পাপ; যেমন লজ্জাহীনতা, অশ্লীল কনসার্ট, যিনা বা ব্যভিচারের দিকে চলে যায়। এ কারণেই মহান আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সতর্ক করে বলেনঃ
“আর তোমরা যিনা-ব্যভিচারের নিকটবর্তীও হইয়ো না, নিঃসন্দেহে এটি একটি অশ্লীল কাজ এবং অত্যন্ত মন্দ পথ।” (আল-ইসরা: আয়াত ৩২)
আল্লাহ তা‘আলা যিনা করা তো দূরের কথা, এর ধারে কাছে যেতেও নিষেধ করেছেন। কারণ, হারাম পরিবেশে থাকতে থাকতে হারাম কাজ স্বাভাবিক মনে হতে শুরু করে। বিন্দু বিন্দু জল যেমন সাগরে পরিণত হয়, তেমনি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাপ একসময় আসক্তি, যিনা-ব্যভিচার, নগ্নতা, বেহায়াপনা, উলঙ্গ ছবি/ভিডিও তথা মহাপাপের দিকে নিয়ে যায়!
তাই আমাদের উচিত, প্রথম থেকেই সতর্ক থাকা। একবার নফসের ধোঁকায় পা দিলে তা ধীরে ধীরে ভয়াবহ রূপ নিয়ে নেয়। রাসূলুল্লাহ(সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ
“মুজাহিদের মধ্যে সর্বোত্তম হলো সেই ব্যক্তি, যে নিজের নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ করে।” (সুনান তিরমিজি)
পরিশেষে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ
“আমার উম্মতের কিছু লোক এমন হবে যারা ব্যভিচার, রেশম, মদ এবং বাদ্যযন্ত্রকে হালাল মনে করবে।” (সহীহ্ আল-বুখারি: ৫৫৯০)
অথচ এগুলো স্পষ্টত হারাম।
অতএব, জেনেশুনে নফসের ধোঁকায় পড়ে অতল আঁধারে ডুবে যাওয়া কিবা নফসের সাথে আপস করা প্রতিটি ব্যক্তি দেখতে মুসলমান হলেও আসলে তারা প্রকৃত মুসলমান বা মু’মিন নয়—তারা এক হাইব্রিড মুসলমান। হাইব্রিড মুসলমানদের প্রসঙ্গেঃ
“তোমরা কি কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আনো আর কিছু অংশ অস্বীকার করো?” (আল-বাক্বারা: আয়াত ৮৫)
কিন্তু আল্লাহ তা‘আলার আদেশ হলোঃ
“হে মু’মিনগণ! ইসলামের মধ্যে পূর্ণভাবে প্রবেশ করো এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলো না, নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।” (আল-বাক্বারা: আয়াত ২০৮)
“মু’মিনদের বলো তাদের দৃষ্টি অবনত করতে আর তাদের লজ্জাস্থানের হেফাযত করতে।” (আন-নূর: আয়াত ৩০)
একটি কথা মিলিয়ে দেখো
‘সময়ের স্রোতে আজ যে হারাম তোমার চোখে স্বাভাবিক—সেদিন কি সেটাই তোমাকে কাঁদাতো না?’
ভুলে হোক কিবা জেনেশুনেই হোক কোনো ক্ষুদ্র পাপকে হালকা ভাববেন না। এটি ধীরে ধীরে একসময় ভয়ংকর পাপের দিকে নিয়ে যায়। আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ
“নিশ্চয়ই নফস মানুষকে সর্বদা মন্দের দিকে প্ররোচিত করে।” (আল-ইউসুফ: আয়াত ৫৩)
সুতরাং, তাক্বওয়া ধরে রাখতে হলে প্রথম থেকেই নফসের ধোঁকা এড়িয়ে চলুন, নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ করুন—এই জিহাদই সবচেয়ে কঠিন! আল্লাহকে ভয় করুন, পর্দা রক্ষা করুন, চোখ ও মনকে নিয়ন্ত্রণ করুন, এবং বেশি বেশি ইস্তে‘গফার পড়ুন। যে আজই তাওবা করে ফিরে আসে—আল্লাহ তার জন্য রহমতের দরজা সবসময় খোলা রেখেছেন।
আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ
“বলো- হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের উপর বাড়াবাড়ি করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন। তিনি অতি ক্ষমাশীল, অতি দয়ালু।”[১] “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারীদেরকে ভালোবাসেন।”[২] “(এবং) আল্লাহ মুত্তাক্বীদের ভালোবাসেন।”[৩]
১~(আয-যুমার: আয়াত ৫৩) | ২~(আল-বাকারা: আয়াত ২২২) | ৩~(আত-তাওবা: আয়াত ৪)
“নিঃসন্দেহে সে সফলকাম, যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করেছে। আর সে ব্যর্থ হয়েছে, যে নিজ নফসকে কলুষিত করেছে।” (আশ-শামস: আয়াত ৯-১০)
মনে রেখো, যে চোখ আজ হারামে ভিজে—সে চোখ দিয়েই কাল কুর‘আনের আলো ঝলমল করতে পারে, যদি আজই তাওবা করা হয়। হে আল্লাহ! আমাদেরকে মাফ করুন।
“যারা ঈমান এনেছে তাদের জন্য সে সময় কি এখনও আসেনি যে আল্লাহর স্মরণে তাদের অন্তর বিগলিত হয়ে যাবে?” (আল-হাদিদ: আয়াত ১৬)