ধর্মীয় জ্ঞানের বদলে তুমি যৌনতার জ্ঞান কেনো আহরণ করছো?
সে জ্ঞান যদি কাম-উদ্দিপনার জন্য না হয়ে, স্বীয় নফস ও ঈমান হেফাযতের জন্য হয়, সে জ্ঞান যদি হয় গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার ই’লমের জন্য। তবে তুমি কি বলবে?
“বলো- যারা জানে আর যারা জানে না, তারা কি সমান? বিবেক-বুদ্ধিসম্পন্ন লোকেরাই কেবল উপদেশ গ্রহণ করে থাকে।” ~(সূরা আয-যুমার: আয়াত ৯)
উদাহরণ হিসেবে
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যুবকদের উদ্দেশ্যে বলেছেনঃ
“হে যুবসমাজ! তোমাদের মধ্যে যে সামর্থ্য রাখে, সে যেন বিবাহ করে।” ~(সহীহ বুখারি, সহীহ মুসলিম)
এখান থেকে আমরা স্পষ্টত বুঝতে পারি: ইসলাম যৌন প্রবৃত্তিকে অস্বীকার করেনি আবার ঢেকেও রাখেনি; বরং নিয়ন্ত্রণের পথ শিখিয়েছে এবং সুস্পষ্ট বিধান দিয়েছে। মানুষকে মহান আল্লাহ তা‘আলা এমনই ভাবে সৃষ্টি করেছেন যে তাক্বওয়া ও আত্মসংযম ব্যতীত স্বাভাবিক যৌন আকাঙ্ক্ষা দমন করতে পারবে না। সেজন্য রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাদের শিখিয়ে গিয়েছেন—
“হে যুবকেরা! যে বিবাহের সামর্থ্য রাখে না, সে যেন রোজা রাখে। কারণ তা যৌন উত্তেজনা প্রশমনকারী!” ~(সহীহ বুখারী: ৫০৬৬)
ইসলাম লজ্জা শেখায়—কিন্তু অজ্ঞতা শেখায় না। কারণ লজ্জা ঈমানের শাখা—হৃদয়ের বস্ত্র, আর অজ্ঞতা শয়তানের অস্ত্র। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ
“আল্লাহ তা‘আলা সত্য ও হক্ব বিষয় বর্ণনা করতে লজ্জাবোধ করেন না।” ~(সহীহঃ মুসনাদে আহমাদ; মিশকাত: ৩১৯২)
যেখানে মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া-তা‘আলা হক্ব ও সত্য বলতে লজ্জাবোধ করেন না, সেখানে আমরা মুসলমান হয়ে, আল্লাহর বান্দা হিসেবে; ইসলামের সৃষ্টিলগ্ন থেকে চলমান সভ্যতা বিনির্মাণকারী “যৌনতা” সম্পর্কে কুর‘আন-সুন্নাহ মোতাবেক সঠিক জ্ঞান রাখা ও নিজের জীবনে তার প্রভাব প্রয়োগ করতে কিসের এতো ভাবনা? তবে জেনে রাখো এটাই একজন আলেমের(জ্ঞানীর) ই’লম অর্জনের মৌলিক দায়িত্ব ও একজন মু’মিনের অপরিহার্য কাজ।
পবিত্র কুর‘আনে আল্লাহ তা‘আলা সুস্পষ্টভাবে যৌনতা-সংক্রান্ত বিধান দিয়েছেন—লুকোচুরি করে নয়, দ্ব্যর্থক করে নয়; বরং পরিষ্কার ভাষায়, মানবজাতির নফস ও ঈমান হেফাযতের জন্য। আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ
“ঋতুকালে স্ত্রী-সহবাস হতে বিরত থাকো এবং যে পর্যন্ত তারা পবিত্র না হয়, তাদের নিকটবর্তী হয়ো না। তারপর যখন তারা পবিত্র হবে, তখন তাদের সঙ্গে সহবাস করো, যেভাবে আল্লাহ অনুমতি দিয়েছেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাহ্কারীদেরকে ভালোবাসেন এবং পবিত্রতা অবলম্বনকারীদেরকেও ভালোবাসেন। আর, তোমাদের স্ত্রীগণ তোমাদের শস্যক্ষেত্র। সুতরাং তোমরা তোমাদের শস্যক্ষেত্রে যেভাবে ইচ্ছে গমন করো।” ~(সূরা আল-বাক্বারা: আয়াত ২২২–২২৩)
এই আয়াত দু’টি আমাদের কী শেখায়?
- নফস নিয়ন্ত্রণ: এখানে বলা হয়েছে যৌন সম্পর্ক শুধু প্রয়োজন ও সীমার মধ্যে। অর্থাৎ, যৌন সম্পর্ক এমনভাবে হওয়া উচিত যা নফস ও ঈমান হেফাযতের মধ্যে হয় এবং মানবিক ও ধর্মীয় সীমারেখা লঙ্ঘন না করে। “নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না।” ~(সূরা হুদ: আয়াত ১১২ | সূরা আল-বাক্বারা: আয়াত ১৯০)
- স্বাস্থ্য ও হেফাযত: হায়িযকালে সম্পর্ক না করার বিধান—শরীর ও ধর্ম উভয় রক্ষার লক্ষ্য। অর্থাৎ, মাসিক অবস্থায় সহবাস হারাম—এটা স্বাস্থ্য, নৈতিকতা ও তাক্বওয়া তিনটাই রক্ষা করে। “মাসিকাবস্থায় সঙ্গম করা এক প্রকার কুফরী।” ~(আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, নাসাঈ) | “মাসিক অবস্থায় সঙ্গমে স্বামী-স্ত্রীর উভয়ের পক্ষে স্বাস্থ্যগত বিশেষ ক্ষতি রয়েছে অনেক।” ~(তুহফাতুল আরুস, পৃ:১৩৯)
- যৌনতা নিজে হারাম নয়—হারাম হলো সীমালঙ্ঘন।
- পায়ুকাম তথা মলদ্বারে সঙ্গম নিষিদ্ধ: কারণ “শস্যক্ষেত্র” উপমা দ্বারা স্পষ্ট করা হয়েছে যে স্বাভাবিক পথ অর্থাৎ যোনিপথ ছাড়া অন্য কোনো পথে গমন বৈধ নয়। “স্ত্রীর পায়ুপথে (মলদ্বারে) সঙ্গম হারাম—যে ব্যক্তি এমন কাজ করে সে অভিশপ্ত। এমন ব্যক্তির দিকে আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাকিয়েও দেখবেন না। গুহ্যদ্বারে সঙ্গম এক প্রকার কুফরী(গুরুতর গুনাহ)।” ~(আবু দাউদ, মুসনাদে আহমদ | নাসাঈ, তিরমিযী | আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ)
- জ্ঞান-ভিত্তিক ব্যবহার: ইসলামি যৌনতার জ্ঞান মানে শুধু কাম-উদ্দিপনা নয়; এটি নৈতিক, শরীরিক ও ঈমান হেফাযতের জন্য।
এখন বাস্তব উদাহরণ ধরি,
একজন ব্যক্তি নিয়মিত নামায পড়ে। রোজা রাখে। দ্বীনের প্রতি ভালোবাসাও রাখে। কিন্তু সে শুধুই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা প্রাথমিক ধর্মীয় শিক্ষা নিয়েছে—বিজ্ঞান, থিসিস, হিসাব, অর্থনীতি, নামাযের মাস‘আলা, রোজার মাস‘আলা, হজ্জ নিয়ম, সামাজিক নীতি/রাষ্ট্রীয় আইন ইত্যাদি জানে। কিন্তু সে জানে না:
- স্ত্রীর সঙ্গে পায়ুকাম হারাম,
- মাসিক অবস্থায় সহবাস হারাম,
- যৌন সম্পর্কেও শরীয়তের সীমারেখা আছে,
- বিকৃত যৌনতার ফলাফল কী হবে?
সে হয়তো অজ্ঞতাবশত এমন কাজ করে বসবে, যেটাকে সে “স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত বিষয়” ভেবে হালাল মনে করছে—কিন্তু বাস্তবে সেটা স্পষ্ট হারাম এবং কবীরা গুনাহ।
এখন প্রশ্নটা ভয়ংকর হয়ে দাঁড়ায়—তার ঈমান কি তখন নিরাপদ? তার ইবাদত কি তখন পরিপূর্ণ? তার নামায-রোজা কি তখন তাকে জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে পারবে? উত্তর: —না।
কারণ যে ই’লম তাকে হারাম চিনতে শেখায় না, সে ই’লম তাকে আল্লাহর কাছে অপরাধী বানিয়েই ছাড়বে। এটাই হলো “নিয়ন্ত্রিত ই’লম”-এর সবচেয়ে ভয়াবহ উদাহরণ—যেখানে একজন মানুষকে নামায শেখানো হয়, কিন্তু স্বীয় নফস শাসনের ই’লম শেখানো হয় না। যেখানে তাকে কুর‘আন তিলাওয়াত শেখানো হয়, কিন্তু কুর‘আনের অর্থ অথবা বিষয়ভিত্তিক তাফসির তথা যৌনতার স্পষ্ট বিধান শেখানো হয় না। ফলে দ্বীনের একটা অংশ জানা হয়—আর আরেকটা অংশ অজানাই থেকে যায়। আর এই অজ্ঞ অংশটাই একদিন তাকে ধ্বংস করে দেয়। তাই কেউ যদি বলে—“ইসলামি যৌনতার জ্ঞান ঝুঁকিপূর্ণ”
আমি বলবো—কুর‘আনী জ্ঞান কখনো ঝুঁকিপূর্ণ হয় না, ঝুঁকিপূর্ণ হয় অজ্ঞতা। কারণ এই অজ্ঞতাই মানুষকে এমন গুনাহে ফেলে, যে গুনাহকে সে গুনাহই মনে করে না। আর এটাই শয়তানের সবচেয়ে সফল স্ট্র্যাটেজি: হারামকে ‘স্বাভাবিক’ বানিয়ে দেওয়া, আর অজ্ঞতাকে ‘লজ্জা’ বলে চালিয়ে দেওয়া। তাই আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ
“পড়! তোমার প্রতিপালকের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন, সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট-বাঁধা রক্তপিন্ড হতে। যিনি শিক্ষা দিয়েছেন কলম দিয়ে, শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না।” ~(সূরা আল-আলাক: আয়াত ১-৫)
আর মনে রেখো:
“তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে আর যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে, আল্লাহ তাদেরকে মর্যাদায় উচ্চ করবেন। তোমরা যা করো আল্লাহ তার খবর রাখেন।” ~(সূরা আল-মুজাদিলা: আয়াত ১১)
পবিত্র কুর‘আনে আল্লাহ তা‘আলা শুধু হারাম কাজ নিষিদ্ধ করেননি—বরং হারামের দিকে যাওয়ার পথও বন্ধ করে দিয়েছেন। তিনি বলেনঃ
“আর তোমরা যিনা-ব্যভিচারের নিকটবর্তীও হয়ো না; নিঃসন্দেহে এটি একটি অশ্লীল কাজ এবং অত্যন্ত মন্দ পথ।” ~(সূরা বনী-ইসরাঈল: আয়াত ৩২)
লক্ষ্য করো—আয়াতে বলা হয়নি “যিনা-ব্যভিচার করো না”; বরং বলা হয়েছে “নিকটবর্তীও হয়ো না”। অর্থাৎ, দৃষ্টি, কল্পনা, স্পর্শ, কথাবার্তা—সবই এর অন্তর্ভুক্ত। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ
“কোন বেগানার(গা‘য়রে মাহরাম) প্রতি দৃষ্টি দেওয়া চোখের যিনা, অশ্লীল কথাবার্তা বলা জিহ্বার যিনা, অবৈধভাবে স্পর্শ করা হাতের যিনা, ব্যভিচারের উদ্দেশ্যে হেঁটে যাওয়া পায়ের যিনা, খারাপ কথা শোনা কানের যিনা আর যিনার কল্পণা করা ও আকাঙ্ক্ষা করা মনের যিনা। অত:পর লজ্জাস্থান একে পূর্ণতা দেয় অথবা অসম্পূর্ণ রেখে দেয়।” ~(সুনানে আবু দাউদ: ২১৫২)
এ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা নির্দেশ দেন—
“মু’মিন পুরুষদের বলো—তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত করে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাযত করে। আর মু’মিন নারীদের বলো—তারাও যেন তাদের দৃষ্টি অবনত করে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাযত করে।” ~(সূরা আন-নূর: আয়াত ৩০–৩১)
এখন প্রশ্নটা খুব মৌলিক হয়ে যায়—যে ব্যক্তি এই আয়াতগুলোর বিধানই জানে না, যে ব্যক্তি দৃষ্টি, লজ্জাস্থান ও নফসের সম্পর্কই বোঝে না, সে কিভাবে আমল করবে? সে কিভাবে নিজের ঈমান হেফাযত করবে? কারণ আমল তো ই’লমেরই ফল। ই’লম ছাড়া আমল—অন্ধ অনুকরণ যা পরবর্তীতে বিদ‘আতে রূপান্তরিত হতে পারে। আর অজ্ঞতার উপর দাঁড়িয়ে থাকা আমল—দীর্ঘস্থায়ী হয় না। জেনে রাখো রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছনঃ
“মুজাহিদের মধ্যে সর্বোত্তম হলো সেই ব্যক্তি, যে নিজের নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ করে।” ~(তিরমিজি)
“নিশ্চয়ই নফস মানুষকে সর্বদা মন্দের দিকে প্ররোচিত করে।” ~(সূরা আল-ইউসুফ: আয়াত ৫৩)
কিন্তু নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ করবে কী দিয়ে?—অজ্ঞতা দিয়ে? না কি শুধু আবেগ দিয়ে?
—না। নফসের বিরুদ্ধে জিহাদের প্রথম অস্ত্র হলো—হারাম ও হালালের সুস্পষ্ট জ্ঞান। এই জন্যই আল্লাহ তা‘আলা কেবল আংশিক দ্বীন পালনের হুকুম করেননি। তিনি বলেনঃ
“হে মু’মিনগণ! তোমরা ইসলামের মধ্যে পূর্ণভাবে প্রবেশ করো।” ~(সূরা আল-বাক্বারা: আয়াত ২০৮)
এই আয়াত আমাদের স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয় যে—ইসলামে শুধু নামায জানলেই চলবে না, শুধু রোজা বা আক্বীদা জানলেই যথেষ্ট না, শুধু প্রাতিষ্ঠানিক বা নির্বাচিত ই’লমে সীমাবদ্ধ থাকা চলবে না, বরং—
- ইবাদতের ই’লম
- লেনদেনের ই’লম
- চরিত্রের ই’লম
- দ্বীন ও যমিন রক্ষার ই’লম
- দুনিয়া পরিচালনার ই’লম
- তলোয়ার হাতে তোলার ই’লম
- অশ্রু ও রক্ত ঝরানোর ই’লম
- নফস ও যৌন প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণের ই’লম
সব মিলিয়েই ইসলাম পূর্ণ হয়। না পারলে সব জানতে, না পারলে সব আমল করতে—তবুও চেষ্টা করতে হবে, খুঁজতে হবে, শিখতে হবে, তদ্রূপ আমল করতে হবে। কারণ আমরা মুসলমান, আমরা শ্রেষ্ঠ নবী বিশ্বনবী হযরত মোহাম্মদূর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর উম্মত। মনে রেখো: পূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ মানে—নিজের জীবনকে দ্বীনের সব নির্দেশনার সামনে সোপর্দ করা, এক আল্লাহর জন্য নিজেকে কোরবান করা। এমন অনেক সম্প্রদায় ছিল, যারা অর্ধেক মানতো আর অর্ধেক মানতো না, তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা আয়াত নাযিল করেন—
“তোমরা কি কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আনো আর কিছু অংশ অস্বীকার করো?” ~(সূরা আল-বাক্বারা: আয়াত ৮৫)
সুতরাং যে ব্যক্তি বলে—“এইসব জানার দরকার নেই, ঐ সব জানার দরকার নেই, এগুলো ঝুঁকিপূর্ণ, ওগুলো ঝুঁকিপূর্ণ”—সে মূলত আল্লাহর এই নির্দেশকেই অস্বীকার করে।
বাস্তবতা হলো—যে ই’লম দৃষ্টি হেফাযত শেখায় না, যে ই’লম লজ্জাস্থান হেফাযত শেখায় না, যে ই’লম নফসের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখায় না, যে ই’লম দ্বীনের জন্য সামান্য ভ্রু কুঁচকাতেও শেখায় না, যে ই’লম হক্বকে যমিনে প্রতিষ্ঠা করতে শেখায় না, যে ই’লম রবের দুয়ারে অশ্রু ঝরাতে শেখায় না, যে ই’লম ঈমানের মিষ্টতা অনুভব করায় না—সে ই’লম মানুষকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে না; বরং ধীরে ধীরে গুনাহের দিকে ঠেলে দেয়। কারণ ঈমান মসজিদে-মিম্বরে টিকে থাকে না—ঈমান টিকে থাকে অন্তরে, হৃদয়ে, চোখে, কানে, জবানে, নিয়তে, চিন্তায় ও প্রবৃত্তিতে। আর এ কারণেই বলা যায়—অজ্ঞতা ঈমানের শত্রু, আর পূর্ণাঙ্গ ই’লম ঈমানের প্রহরী।
যৌনতা—যেমন সভ্যতা সৃষ্টি করতে পারে তেমনই পৃথিবীর যত উল্লেখযোগ্য সভ্যতা ধ্বংস হয়েছে তার সবই যৌনতার ফিতনা দ্বারাই হয়েছে।
উদাহরণ স্বরূপ, পবিত্র কুর‘আনে সুস্পষ্টভাবে এমন এক জাতির কথা উল্লেখ আছে যারা অবাধ যৌনতা ও চরম অশ্লীলতার কারণে ধ্বংস হয়েছে। আর তারা হলো: কওমে লূত তথা [লূত (আ.) এর জাতি]।
“অতঃপর আমি তাদের উপর এমন এক শাস্তি পাঠালাম, যা ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। আমি তাদের নগরীগুলো উপর-নিচ করে উল্টে দিলাম এবং তাদের উপর পাথরের বৃষ্টি বর্ষণ করলাম।...যালিমদের জন্য এ শাস্তি বেশি দূরের ব্যাপার নয়।” ~(সূরা হুদ: আয়াত ৮২–৮৩) “অতঃপর তাদেরকে এক বিকট আওয়াজ পাকড়াও করল সূর্যোদয়ের সময়।” ~(সূরা আল-হিজর: আয়াত ৭৩)
আল্লাহর সমস্ত নিদর্শন তথা তাদের এই আযাবের পরিণাম থেকে শিক্ষা গ্রহণের জন্য পরবর্তী জাতির উদ্দেশ্যে মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “মু’মিনদের জন্য এতে রয়েছে বড়ই নিদর্শন।” ~(সূরা আল-হিজর: আয়াত ৭৭)
আমরা যদি ইসলামের আলোকে যৌনতা সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান না রাখি, তাহলে কিভাবে নিজের ঈমান ও নফসের হেফাযত করবো? মনে রেখো, “নিঃসন্দেহে সে'ই সফলকাম, যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করেছে। আর সে'ই ব্যর্থ হয়েছে, যে নিজ নফসকে কলুষিত করেছে।” ~(সূরা আশ-শামস: আয়াত ৯-১০)
অতএব, যৌনতা যখন তাক্বওয়া ছাড়িয়ে যায়, তখন তা আর প্রবৃত্তি থাকে না—সভ্যতা ধ্বংসের হাতিয়ার হয়ে যায়।
ইসলাম এমন কোনো ধর্ম নয় যেখানে শুধু আকাশমুখী ইবাদত শেখানো হয়। যে দ্বীন নামায শেখায়—সেই দ্বীনই দৃষ্টি, লজ্জাস্থান, কামনা ও প্রবৃত্তি হেফাযতের ই’লমও শেখায়। যে জ্ঞান আমাকে হারাম চিনতে শেখায় না, যে জ্ঞান আমাকে আমার নফসের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে সক্ষম করে না—সে জ্ঞান দিয়ে আমি কী করবো?
কুর‘আনে “ই’লম” মানে শুধু তথ্য নয়—বরং তাক্বওয়া (আল্লাহভীতি) জন্ম দেয় এমন জ্ঞান।
“আল্লাহকে তাঁর বান্দাদের মধ্যে জ্ঞানীরাই বেশি ভয় করে।” ~(সূরা ফাতির: আয়াত ২৮)
ইসলামিক যৌনতা-সংক্রান্ত জ্ঞান যদি কামোত্তেজনার জন্য না হয়ে নফসের নিয়ন্ত্রণ ও ঈমানের হেফাযতের জন্য হয়, তবে সেটি ধর্মীয় জ্ঞানেরই অংশ। “নিশ্চয়ই সমস্ত কাজ নিয়তের উপর নির্ভরশীল।” ~(সহিহ আল-বুখারি, হাদিস: ১)
উসূলুল ফিক্হের সর্বসম্মত নীতি অনুযায়ী:
ما لا يتم الواجب إلا به فهو واجب
“হারামে পতিত হওয়া ঠেকাতে যে জ্ঞান প্রয়োজন—সে জ্ঞান অর্জন করাও ফরজের অন্তর্ভুক্ত।” ~(উসূলুল ফিক্হ: আল-জুওয়াইনি, আল-গাজ্জালি, ইবন্ তাইমিয়্যাহ)
সুতরাং, এমন ধর্মীয় জ্ঞান দিয়ে আমি অদম কি করবো? যদি না ঈমান বিধ্বংসী—যৌনাঙ্গের হেফাযত করতে পারি। যদি না আখেরাতে জবাব দিতে পারি।
পরিশেষে,
যৌনতা সম্পর্কে অজ্ঞতা, অবাধ যৌনতা, বিকৃত যৌনতা, যৌন অশ্লীলতা মানুষকে আর মানুষ রাখে না—বানিয়ে দেয় পশুর চেয়েও আরো নামান্তর।
“তারা পশুর চেয়েও পথভ্রষ্ট, তারা একেবারে বেখবর।” ~(সূরা আল-আ‘রাফ: আয়াত ১৭৯)
কোর‘আন-সুন্নাহ সম্মত যৌন-জ্ঞান মানুষকে ফিতনা থেকে সতর্ক করে, ঈমান মজবুত করে, তাক্বওয়া বৃদ্ধি করে, হায়াশীল বানায়, লজ্জাশীলা বানায়, গা‘য়রতওয়ালা বানায়; আর এই অপরিহার্য যৌন জ্ঞান সম্পর্কে অজ্ঞতা মানুষকে হায়াহীন বানায়, অশ্লীল বানায়, গা‘য়রতহীন এক বর্বর যাযাবর বানায়। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ
“হায়া(লজ্জা) হলো ঈমানের একটি শাখা। যখন মানুষের মধ্য হতে হায়া হারিয়ে যাবে, তখন তারা যা ইচ্ছে তাই করতে থাকবে।” ~(সহীহ বুখারি, সহীহ মুসলিম | সহীহ বুখারি)
যে দ্বীন ঋতুকাল, সহবাস, পদ্ধতি ও পথ পর্যন্ত নির্ধারণ করে দিয়েছে—সে দ্বীনে যৌনতা কখনো ‘ট্যাবু’ হতে পারে না। যাইহোক—
“যে ব্যক্তি অজ্ঞতাবশত গুনাহ করে অতঃপর আল্লাহকে ভয় করে তওবাহ করে এবং ঈমান রক্ষার জন্য জ্ঞান অনুসরণ করে—আল্লাহ তাকে সহায়তা করেন ও তার তওবাহ কবুল করেন।” ~[সূরা আন-নিসা: আয়াত ১৭ (তাফসীর অনুযায়ী)]
শেষ একটি কথা কখনো ভুলো না: যে ই’লম তোমাকে/আমাকে হারাম চিনতে শেখায় না, সে ই‘লম তোমাকে/আমাকে একদিন হারামের দাস বানাবে। আমরা সন্তানদের ইসলামের বিধিবিধান অনুসারে যৌনতার ই’লম শেখাতে ভয় পাই, তথাকথিত লজ্জা পাই কিংবা অবহেলা করি কিন্তু পশ্চিমা বিকৃত যৌনতা, ফ্রী-সেক্স কালচার অথবা পর্নোগ্রাফি যেন তাদের শিক্ষক না হয়—সে ব্যাপারে আমাদের কোনো খবর নাই। আর খবর থাকবেই বা কি করে, আমাদের নিজেদেরই তো দ্বীনের পূর্নাঙ্গ ই’লম নেই, দ্বীনি ই’লমের অভাবে আমরা নিজেররাই আছি এক বিভ্রান্তিতে। হায় আফসোস!
তাই, আজকের সমাজে প্রতিনিয়ত গুনাহ-গাফিলতি বাড়তেছে অজ্ঞতার কারণে নয়—বরং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে খন্ডিত, একপাক্ষিক ও নিয়ন্ত্রিত ই’লমের ফলে। অর্থাৎ, অজ্ঞতা ফিতনার বীজ—আর নিয়ন্ত্রিত ই’লম তার সার। যে সমাজে যৌনতা নিয়ে ইসলাম কথা বলতে পারে না, সে সমাজে শয়তান একচেটিয়া নিয়ন্ত্রক হয়ে যায়।
অতএব, কেউ যদি বলে—“ইসলামি যৌনতার জ্ঞান ঝুঁকিপূর্ণ।” আমি বলবো—অজ্ঞতাই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ, আর নীরবতা তার সবচেয়ে বড় সহচর।
সর্বশেষে,
যে যত বেশি ই’লমওয়ালা, সে তত বেশি ঈমানওয়ালা।
“নিশ্চয়ই এতে চিন্তাশীলদের প্রতি রয়েছে গভীর নিদর্শন।” ~(সূরা আল-হিজর: আয়াত ৭৫)
হে আল্লাহ! আমাদের লজ্জাস্থান, হৃদয় ও দৃষ্টি রক্ষা করুন, আমাদের দ্বীনের সঠিক ই’লম দান করুন এবং আমাদেরকে মাফ করুন। আমীন।