মানুষ সাধারণত কিছু পাপ করে সমাজের ভয়ে!
“সমাজ কী বলবে” এই চিন্তাকে সামনে রেখে। হায়! মানুষ আল্লাহকে নয় দুনিয়াবি সম্মান/ইজ্জতকেই বেশি ভয় করে। অথচ এই সম্মান/ইজ্জতই দেওয়ার মালিক একমাত্র আল্লাহ। হে মুসলিম! তুমি কেন বুঝো না? দুনিয়াবি সম্মান/ইজ্জত এতটাই ঠুনকো যে—কোনো মানুষ এটাকে ধরে রাখতে চাইলেও পারবে না, যদি না সে মহান আল্লাহকে ভয় করে, অতঃপর আল্লাহ তা কেড়ে নেন। আবার আল্লাহ যখন কাউকে সম্মান/মর্যাদা দান করেন, তখন কোনো মানুষ তাকে অপমানিত করতে পারে না—যতক্ষণ না আল্লাহ তা চান।
প্রথমত- রিযক শুধু ভাত, মাছ, বাড়ি, কাপড়, সম্পদ ইত্যাদি নয়—সম্মান/ইজ্জতও রিযক-এর অন্তর্ভুক্ত, এটিও আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া-তা‘আলার একটি নি'আমত। আল্লাহর নিকট প্রকৃত সম্মান/ইজ্জত ও মর্যাদা একমাত্র তাক্বওয়ার মাধ্যমেই অর্জিত হয়। এজন্য প্রকৃত সম্মান/ইজ্জত ও মর্যাদা কেবল মু’মিন-মুত্তাক্বীদের জন্যই।
“আর অবশ্যই আমি আদম সন্তানকে মর্যাদাবান করেছি...।” ~(সূরা আল-ইসরা: ৭০)
“নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সেই-ই সর্বাধিক সম্মানিত, যে সর্বাধিক তাক্বওয়াবান।” ~(সূরা আল-হুজুরাত: ১৩)
“যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য (সমস্যা থেকে উদ্ধার পাওয়ার) কোনো না কোনো পথ বের করে দিবেন। এবং তাকে রিযক দিবেন (এমন উৎস) থেকে যা সে কল্পনাও করতে পারে না। যে কেউ আল্লাহর উপর ভরসা করে, তবে তার জন্য তিনিই যথেষ্ট।” ~(সূরা আত-তালাক: ২-৩)
“নিশ্চয়ই আল্লাহই তো রিযকদাতা, মহা শক্তিধর, প্রবল পরাক্রান্ত।” ~(সূরা আয-যারিয়াত: ৫৮)
আল্লাহ কারো প্রতি ভালোবাসা স্থাপন করলে মানুষের কাছেও তাকে প্রিয় করে দেন। আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্নিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া-সাল্লাম) বলেছেন: “আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন তখন তিনি জিবরাঈল (আঃ)-কে ডেকে বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ অমুক বান্দাকে ভালোবাসেন, কাজেই তুমিও তাকে ভালোবাসো।’ তখন জিবরাঈল (আঃ)-ও তাকে ভালোবাসেন এবং জিবরাঈল (আঃ) আকাশের অধিবাসীদের মধ্যে ঘোষণা করে দেন যে, ‘আল্লাহ অমুক বান্দাকে ভালোবাসেন। কাজেই তোমরা তাকে ভালোবাসো।’ তখন আকাশের অধিবাসী তাকে ভালোবাসতে থাকে। অতঃপর পৃথিবীতেও তাকে সম্মানিত করার ব্যবস্থা করে দেয়া হয়।” ~(সহীহ বুখারী: ৩২০৯, সহীহ মুসলিম: ২৬৩৭)
দ্বিতীয়ত- তাক্বওয়া ব্যতীত সম্মান/ইজ্জত মরিচীকা মাত্র। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া-সাল্লাম) বলেছেন: “হে মানুষ! তোমাদের রব একজন, তোমাদের পিতাও একজন। কোনো আরবের ওপর অনারবের, অনারবের ওপর আরবের, শ্বেতাঙ্গের ওপর কৃষ্ণাঙ্গের কিংবা কৃষ্ণাঙ্গের ওপর শ্বেতাঙ্গের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই; শ্রেষ্ঠত্ব কেবল তাক্বওয়ার দ্বারা।” ~(মুসনাদে আহমাদ: ২৩৪৮৯, শুয়াবুল ঈমান)
যে ব্যক্তি সমাজের সম্মান রক্ষার জন্য আল্লাহকে অমান্য করে, আল্লাহর অবাধ্য হয়, সে প্রকৃত সম্মানের উৎসকে ছেড়ে ক্ষণস্থায়ী মরীচিকার পেছনে ছুটছে। আর যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহই তাকে প্রকৃত ইজ্জত ও মর্যাদা দান করেন। আল্লাহর আনুগত্যই প্রকৃত সম্মানের পথ; আর তাঁর অবাধ্যতা অপমান/লাঞ্ছনার পথ। এজন্য, যে ব্যক্তি দুনিয়া ও আখিরাতের সম্মান কামনা করে, সে যেন আল্লাহর আনুগত্য করে। কারণ সমস্ত সম্মান/ইজ্জত আল্লাহর হাতে। তিনি যাকে ইচ্ছা সম্মানিত করেন এবং যাকে ইচ্ছা অপমানিত করেন।
“বলুন, হে আল্লাহ! রাজত্বের মালিক! আপনি যাকে ইচ্ছা রাজত্ব দান করেন, যাকে ইচ্ছা রাজত্ব কেড়ে নেন; যাকে ইচ্ছা সম্মানিত করেন এবং যাকে ইচ্ছা অপমানিত করেন। সকল কল্যাণ আপনার হাতেই।” ~(সূরা আলে-ইমরান: ২৬)
“...তারা কি তাদের কাছে ইযযত কামনা করে? ইযযতের সবকিছুই আল্লাহর অধিকারে।” ~(সূরা আন-নিসা: ১৩৯)
“কেউ সম্মান-সুখ্যাতি চাইলে (আল্লাহকে উপেক্ষা করে তা লাভ করা যাবে না), সে জেনে নিক যাবতীয় সম্মান-সুখ্যাতির অধিকারী হলেন আল্লাহ। তাঁরই দিকে উত্থিত হয় পবিত্র কথাগুলো আর সৎকাজ সেগুলোকে উচ্চে তুলে ধরে। যারা মন্দ কাজের চক্রান্ত করে তাদের জন্য আছে কঠিন শাস্তি। তাদের চক্রান্ত নিষ্ফল হবে।” ~(সূরা ফাতির: ১০)
“...সমস্ত মান মর্যাদা তো আল্লাহর, তাঁর রসূলের এবং মু’মিনদের...।” ~(সূরা আল-মুনাফিকূন: ৮)
কোন এক সময় উম্মুল মু’মিনীন আয়েশা (রাঃ)-কে মু’আবিয়া (রাঃ) লিখে পাঠান: আমাকে লিখিতভাবে কিছু উপদেশ দিন, তবে তা যেন দীর্ঘ না হয়। তিনি (বর্ণনাকারী) বলেন, আয়েশা (রাঃ) মু’আবিয়া (রাঃ)-কে লিখলেন: আপনাকে সালাম। তারপর এই যে, আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া-সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি: “যে ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি আকাঙ্ক্ষা করে তা মানুষের অসন্তুষ্টি হলেও, মানুষের দুঃখ-কষ্ট হতে বাঁচানোর জন্য আল্লাহ তা‘আলাই তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যান। আর যে ব্যক্তি মানুষের সন্তুষ্টি আশা করে আল্লাহ তা‘আলাকে অসন্তুষ্ট করে হলেও, আল্লাহ তা‘আলা তাকে মানুষের দায়িত্বে ছেড়ে দেন। আপনাকে আবারো সালাম।” ~(জামে' আত-তিরমিজি: ২৪১৪, সহীহাহ: ২৩১১, তাখরীজ তাহাভীয়া: ২৭৮; সহিহ)
পরিশেষে- মনে রেখো, ব্যক্তির ঈমান ও তাক্বওয়া ব্যতীত—মৃত্যুর সাথে সাথে ধন-সম্পদ, বাড়ি-গাড়ী, পদ-পদবি, সম্মান/ইজ্জত সবকিছুই মাটির সাথে মিশে যাবে। অতএব, কিসের পেছনে ছুটছো—নিশ্চিত গন্তব্য ফেলে? সুযোগ ফুরোয় নি, পথ হয়তোবা এখনো বাকি।
আল্লাহ তা‘আলা কী তোমাকে বলেন নি, যে—
“তোমরা মানুষকে ভয় করো না; আমাকে ভয় করো।” ~(সূরা আল-মায়িদাহ: ৪৪)
“দুনিয়ার জীবন খেল-তামাশা ছাড়া আর কিছুই না। যারা তাক্বওয়া অবলম্বন করে তাদের জন্য পরকালের জীবনই অতি কল্যাণময়, তবুও কি তোমাদের বোধদয় হবে না?” ~(সূরা আল-আন‘আম: ৩২)
“তোমাদের কী হলো যে, তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বের পরোয়া করছ না?” ~(সূরা নূহ: ১৩)
“হে মানুষ! তোমাকে কিসে তোমার মহান প্রতিপালক সম্বন্ধে বিভ্রান্ত করল?” ~(সূরা আল-ইনফিত্বার: ০৬)
[আমরা মানুষ, আমাদের ভুল হতে পারে। তাই, ভুল-ত্রুটি মার্জনীয়।]