“আফসোস! আমরা যেভাবে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ সাদা পোশাককে বাঁচিয়ে রাখি—সেভাবে যদি আমাদের ঈমানকে বাঁচিয়ে রাখতাম, আমাদের তাক্বওয়াকে আগলে রাখতাম। অথচ হায়! গুনাহের দাগে কালো হয়ে যাওয়া হৃদয় নিয়ে আমরা কত সহজেই ঘুমিয়ে পড়ি।”
আমরা আমাদের গুরুত্বপূর্ণ বা দামী সাদা পোশাকটি ধুলোবালি, দাগ কিংবা সামান্য ময়লা থেকেও বাঁচিয়ে রাখতে কত যত্নশীল! একটু দাগ পড়লেই অস্থির হয়ে যাই, কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিজের প্রানপন চেষ্টা করি। অথচ একবারও কি ভেবে দেখেছি? আমাদের জীবনের শেষ পোশাকটিও হবে সাদা। সেই কাফন—যা হবে আমাদের কবর জীবনের পোশাক। কখনোও কি ভেবে দেখেছি কিভাবে এই পোশাকটিকে ভয়ংকর আযাবের হাত থেকে বাঁচাবো?
অর্থাৎ, আমরা দামী ব্র্যান্ডের সাদা পোশাকটি ইস্ত্রি করে ধুলোবালি থেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করি। অথচ দুনিয়ার এই পোশাকটির স্থায়িত্ব বড়জোড় কয়েক বছর, প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে অস্তিত্বহীন পড়ে রবে।
অন্যদিকে, ‘লিবাসুত তাক্বওয়া’ বা পরহেজগারির সেই অদৃশ্য পোশাকটি—আমাদের সাথে কবরে যাবে এবং চির বিচার দিবস তথা হাশরের ময়দানে আমাদের সম্মান রক্ষা করবে। এজন্য, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া-তা‘আলা বলেনঃ “আর তাক্বওয়ার পোশাকই হলো সর্বোত্তম পোশাক।”[১]
সালাফগণ তাক্বওয়াকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করতেন—যেন কেউ কাঁটাযুক্ত পথে নিজের কাপড় বাঁচিয়ে সতর্কভাবে হাঁটে। বর্নিত আছে, “উমর ইবনুল খাত্তাব (রাযিঃ) উবাই ইবন কা'ব (রাযিঃ)-কে তাক্বওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিলে তিনি পাল্টা প্রশ্ন করিলেন, আপনি কি কাঁটাযুক্ত/কণ্টকাকীর্ণ পথে চলিয়াছেন? তিনি জবাবে বলিলেন- হ্যাঁ। উবাই প্রশ্ন করিলেন- তখন আপনি কি করেন? তিনি উত্তর দিলেন- সতর্কতার সহিত কাঁটার আঁচড় হইতে শরীর ও কাপড় বাঁচাইয়া চলি। উবাই (রাযিঃ) বলিলেন- উহাই তাক্বওয়া।”[২]
আমার প্রিয় দ্বীনি ভাই ও বোন!
প্রাথমিক অবস্থায় একজন মু’মিনের আসল লড়াই ও সংগ্রাম তো নিজের নফস তথা কুপ্রবৃত্তির সাথে, পরে তা ময়দান থেকে মৃত্যু- যতদুর গড়ায়—গড়াক।[৩] সাদা পোশাকে কাদার ছিটে লাগলে আমরা যেমন অস্থির হয়ে যাই—অন্তরে গুনাহ-গাফিলতি, হিংসা বা অহংকারের দাগ লাগলে তার চেয়েও বেশি অস্থির হওয়া প্রয়োজন। মনে রেখো: আমাদের দুনিয়াবি সাদা পোশাকটি কেবল কবরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত কাজে লাগবে, কিন্তু আমাদের ‘তাক্বওয়ার পোশাক’ তথা লিবাসুত তাক্বওয়া কবরের পর অনন্তকালের সঙ্গী হবে। পোশাকের ঝকঝকে সাদা রঙের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো হৃদয়ের স্বচ্ছতা। অন্তরে নাফরমানি, পাপাচার, গোমরাহি, গাফিলতি, হিংসা, অহংকার বা কলুষতা থাকলে বাইরের শুভ্র পোশাক কেবল একটি আবরন মাত্র। যেমন, দুনিয়ার সাদা কাপড় পরিষ্কার রাখতে প্রয়োজন উন্নত মানের ডিটারজেন্ট, তেমনই অন্তরের কালো দাগ কিংবা গুনাহের আঁচড় মুছতে প্রয়োজন ‘খালেস তওবা’ এবং ‘আল্লাহর দরবারে অশ্রু ঝরানো’।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া-সাল্লাম) বলেছেনঃ
“বান্দা যখন একটি গুনাহ করে তখন তার অন্তরের মধ্যে একটি কালো দাগ পড়ে। অতঃপর যখন সে গুনাহর কাজ পরিহার করে, ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং তাওবা করে তার অন্তর তখন পরিষ্কার ও দাগমুক্ত হয়ে যায়। সে আবার পাপ করলে তার অন্তরে দাগ বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং তার পুরো অন্তর এভাবে কালো দাগে ঢেকে যায়। এটাই সেই মরিচা আল্লাহ তা‘আলা যার বর্ণনা করেছেন: ‘কখনো নয়, বরং তাদের কৃতকর্মই তাদের মনে জং(মরিচা) ধরিয়েছে।’~(সূরা মুত্বাফফিফীন: ১৪)।”[৪]
অতএব, “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে খাঁটি তওবা করো।”[৫] “নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন।”[৬]
ভুলে গেলে চলবে না—
আমাদের কাফন তথা শেষ সাদা পোশাকটি আমরা নিজেরা কিনতে পারবো না, নিজে পরতেও পারবো না, বরং অন্য কেউ পরিয়ে দিতে হবে। কিন্তু তাক্বওয়ার পোশাক?
তা আমাদের নিজেদেরকেই আজীবন ধরে বুনে যেতে হবে প্রতিটি বিশুদ্ধ নিয়তের মাধ্যমে, প্রতিটি সংগ্রামের মাধ্যমে, প্রতিটি ত্যাগের মাধ্যমে, প্রতিটি ইবাদত ও প্রতিটি নেক আমলের মাধ্যমে—শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত। তাই, পোশাকের অতি শুভ্রতা রক্ষার চেয়ে হৃদয়ের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখাই হোক আমাদের আসল লক্ষ্য, আসল লড়াই। কারণ—রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া-সাল্লাম) বলেছেনঃ
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের শরীর বা তোমাদের অবয়বের দিকে তাকান না; বরং তিনি তোমাদের অন্তর এবং তোমাদের আমলের দিকে তাকান।”[৭] আর, “সেদিন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোনো কাজে আসবে না; তবে যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে আসবে পরিচ্ছন্ন অন্তর নিয়ে।”[৮]
পরিশেষে—
“দুনিয়ার জীবন নিছক খেল-তামাশা ছাড়া আর কিছুই না। যারা তাক্বওয়া অবলম্বন করে তাদের জন্য পরকালের জীবনই অতি কল্যাণকর।”[৯]
“যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার গুনাহ মোচন করে দিবেন, আর তার প্রতিফলকে বিশাল বিস্তৃত করে দিবেন।”[১০] “নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত সেই, যে সবচেয়ে বেশি তাক্বওয়াবান।”[১১] এজন্য, “আল্লাহকে ভয় করো তথা তাক্বওয়া অবলম্বন করো।”[১২] “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের সাথে আছেন যারা তাক্বওয়া অবলম্বন করে।”[১৩] সুতরাং, “তোমরা তোমাদের রবের ক্ষমা ও সেই জান্নাতের দিকে ধাবিত হও, যা মুত্তাক্বীদের জন্য প্রস্তুত।”[১৪] সর্বোপরি জেনে রাখো, “চূড়ান্ত সফলতা মুত্তাক্বীদের জন্য।”[১৫]
সারকথা; খাঁটি ঈমান হলো দুধের মতো—দুধে যেমন যাররা পরিমাণ বিষ মিশে গেলে পুরো দুধটাই বিষ হয়ে নষ্ট হয়ে যায়, তেমনই ঈমানের মধ্যেও যাররা পরিমাণ কুফর, শিরক্ ও (বিদ‘আত) ঢুকে গেলে ঈমান চলে যায়, আক্বীদা নষ্ট হয়ে যায়। আর, তাক্বওয়া হলো ঐ সাদা পোশাকটির মতো—যেটার শুভ্রতা ও ঝকঝকে ভাব তুমি কখনো কমতে দিতে চাও না, যেটাকে তুমি অনাকাঙ্ক্ষিত দূর্ঘটনা থেকে হেফাযতে রাখতে কত কিই-না করতে ব্যস্ত, তারপরও যদি এতে যাররা পরিমাণ দাগ বা অস্বাভাবিক কিছু হয়ে যায় তাতে তুমি অস্থির হয়ে যাও কিভাবে পোশাকটিকে আগের অবস্থায় আনবে।অতএব, “নিশ্চয়ই এতে চিন্তাশীল ও মু’মিনদের প্রতি রয়েছে গভীর নিদর্শন।”[১৬]
সর্বশেষে—
আমার প্রিয় দ্বীনি ভাই ও বোন! দুনিয়াতে যদি তোমার পোশাক হয় অতি নিম্নমানের, অসুন্দর কিংবা ছেড়া-ফাটা—কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু ঐ তাক্বওয়ার পোশাকটি যেন হয় ঈমানে রঙিত শুভ্র-সুমলিন। একটি কথা কখনো ভুলো না: দুনিয়ার পোশাক দুনিয়া দেখে; কিন্তু তাক্বওয়ার পোশাক—দেখেন শুধুমাত্র এক আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া-তা‘আলা।
যেদিন মানুষ তার সবচেয়ে প্রিয় পোশাকও রেখে চলে যাবে, সেদিন তার সঙ্গে থাকবে না কোনো ব্র্যান্ড, কোনো অলংকার, কোনো বাহ্যিক সৌন্দর্য। থাকবে শুধু ঈমান এবং তাক্বওয়ার পোশাক। অতএব, আজই নিজেকে প্রশ্ন করো—আমার আলমারিতে কত রং-বেরঙের পোশাক আছে, তা নয়; বরং আমার অন্তরে কতটুকু তাক্বওয়া আছে?
মোটকথা—
ঈমান মানুষকে মুসলিম বানায়, কিন্তু তাক্বওয়া মানুষকে আল্লাহর প্রিয় বানায়। তাই জেনে রাখো, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া-তা‘আলা বলেনঃ “ওহে ঈমানদারগণ! তোমরা যদি আল্লাহকে ভয় করো তাহলে তিনি তোমাদেরকে ভালো ও মন্দের মধ্যে পার্থক্য করার শক্তি প্রদান করবেন, তোমাদের দোষ-ত্রুটি দূর করে দিবেন এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন, আল্লাহ বড়ই অনুগ্রহশীল।”[১৭] তাছাড়া, “যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য (সমস্যা থেকে উদ্ধার পাওয়ার) কোনো না কোনো পথ বের করে দিবেন। এবং তাকে রিযক দিবেন (এমন উৎস) থেকে যা সে কল্পনাও করতে পারে না। যে কেউ আল্লাহর উপর ভরসা করে, তবে তার জন্য তিনিই যথেষ্ট।”[১৮]
হে আল্লাহ! আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপকে জান্নাতের নিকটবর্তী এবং জাহান্নাম থেকে দূরবর্তী করে দিন। আমীন।
❏ ফুটনোট:
[১]~(সূরা আল-আ’রাফ,৭: আয়াত ২৬)
[২]~(সূরা আল-বাক্বারাহ,২: আয়াত ২ এর তাফসীর • তাফসীর ইবন কাছীর: ১/২৯০ ই.ফা, তাফসীর আত-তাবারি, হিলইয়াতুল আউলিয়া, মাদারিজুস সা-লিকীন)
[৩]~(ফাযালা ইবনু উবাইদ রাযিঃ হতে বর্নিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া-সাল্লাম বলেছেনঃ “যে লোক নিজের নফস তথা প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে জিহাদ করে সে-ই আসল মুজাহিদ।” –জামে' আত-তিরমিজি: ১৬২১ • হাদিসটি হাসান সহীহ; বরং বহু মুহাদ্দিসের নিকট সহীহ)
[৪]~(আবূ হুরাইরাহ রাযিঃ হতে বর্নিত। জামে' আত-তিরমিজি: ৩৩৩৪, সুনান ইবনু মাজাহ: ৪২৪৪ • হাসান হাদিস)
[৫]~(সূরা আত-তাহরীম,৬৬: আয়াত ৮)
[৬]~(সূরা আল-বাক্বারাহ,২: আয়াত ২২২)
[৭]~(আবূ হুরাইরাহ রাযিঃ হতে বর্নিত। সহীহ মুসলিম: ৬৪৩৬; ই.ফা: ৬৩১০, ই.সে: ৬৩৫৯ • সহিহ হাদিস)
[৮]~(সূরা আশ-শুআরা,২৬: আয়াত ৮৮-৮৯)
[৯]~(সূরা আল-আন‘আম,৬: আয়াত ৩২)
[১০]~(সূরা আত-তালাক,৬৫: আয়াত ৫)
[১১]~(সূরা আল-হুজুরাত,৪৯: আয়াত ১৩)
[১২]~(সূরা আল-বাক্বারাহ,২: আয়াত ১৯৭)
[১৩]~(সূরা আন-নাহল,১৬: আয়াত ১২৮)
[১৪]~(সূরা আলে-ইমরান,৩: আয়াত ১৩৩)
[১৫]~(সূরা আল-আ’রাফ,৭: আয়াত ১২৮)
[১৬]~(সূরা আল-হিজর,১৫: আয়াত ৭৫, ৭৭)
[১৭]~(সূরা আল-আনফাল,৮: আয়াত ২৯)
[১৮]~(সূরা আত-তালাক,৬৫: আয়াত ২-৩)
[!]~(তাক্বওয়া = আল্লাহ ভীতি বা সর্বক্ষেত্রে সর্বক্ষণ আল্লাহকে ভয় করা, পছন্দের গুনাহের সুযোগ পেয়েও গুনাহ না করা | ইমাম ইবন রজব রহিমাহুল্লাহ সুন্দর বলেছেনঃ “কেঁদে চোখ ভাসিয়ে দিলেই মুত্তাক্বী হওয়া যায় না। বরং সত্যিকারের মুত্তাক্বী তো সে, যে তার পছন্দের হারাম জিনিসটি হাতের কাছে পেয়েও তা ছেড়ে দেয়—শুধুমাত্র এক আল্লাহর জন্য।” -রাসায়েলু ইবন রজব: ১/১৬৩)
[!]~(যাররা = অতি ক্ষুদ্র বা অণু পরিমাণ/তিল পরিমাণ)