ফুটবল বিশ্বকাপ উন্মাদনা! কিসে তোমায় মোহগ্রস্ত করলো হে যুবক?
তারা অবশ্যই কাফের এবং তাদের সাথে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। “মু’মিনরা যেন মু’মিনদের ছাড়া কাফিরদেরকে বন্ধু না বানায়।”[১]
ভূমিকা:
সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের, যিনি আমাদের এক উম্মাহ হিসেবে সৃষ্টি করেছেন এবং একে অপরের সুখ-দুঃখে অংশীদার হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক মানবতার মুক্তির দূত, প্রিয় নবী মুহাম্মাদূর রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া-সাল্লাম)-এর ওপর।
প্রিয় মুসলিম ভাই ও বোনেরা,
চতুর্দিকে চলছে ফুটবল বিশ্বকাপের বৈশ্বিক উন্মাদনা। যখন পুরো পৃথিবী এই ক্ষণস্থায়ী বিনোদনের জোয়ারে ভাসছে, তখন একজন সচেতন মু’মিন হিসেবে আমাদের চারপাশের বাস্তবতার দিকে তাকানো এবং নিজেদের ঈমানী দায়িত্বের প্রস্তুতি নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। আমরা আপনাদের জন্য ভাই হিসাবে অন্তরের ব্যথিত মন নিয়ে কিছু কথা বলব। (ইন'শা-আল্লাহ)
বিনোদনের আড়ালে ইবলিসের প্রতিশ্রুতি:
আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে আশরাফুল মাখলুকাত হিসাবে সৃষ্টি করেছেন। তিনি অচিরেই প্রত্যেক জ্বীন ও ইনসানের হিসাব গ্রহণ করবেন। আর ইবলিস প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে, সে মানুষকে ভুলিয়ে দিবে তার রব এবং লক্ষ্য সম্পর্কে। মানুষকে ধোঁকা দিবে নানা প্রাচুর্যময় বিষয়ে। আর ইবলিস সবচেয়ে বেশি ফিতনা সাজিয়েছে বিনোদন ও ক্রীড়া জগতে। মানুষকে এক প্রকার অন্ধ ও মাতালের মত উন্মাদ করে দিয়েছে ক্রীড়া বিনোদনের আড়ালে ফুটবলের চাকচিক্য উন্মাদনায়—সে ভুলিয়ে দিয়েছে মুসলিমদের শান, গৌরব ও (গায়রত) আত্মমর্যাদাকে। মুসলমানদের ইজ্জত, সুনাম ও বীরত্বের ইতিহাস ছিল বিশ্বব্যাপী। ইসলামের ইতিহাসে আছে অসংখ্য বীর, যারা পৃথিবীকে দাপট ও গৌরবের সাথে শাসন করেছে।
ফুটবলের জন্য এক যাদুময় আবেগ:
কিন্তু বর্তমান ফুটবলের কারণে—পরাজিত কাফের শক্তির ফুটবলাররা আজ মুসলমান সন্তানদের আইডল হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইবলিস চায় মুসলিমরা নবী-সাহাবাদের এবং সালাফ/মুসলিম বীরদের চাইতে কাফেরদের বেশি অনুসরণ করুক, তাদেরকে বেশি মহব্বত করুক এবং তাদের দিকেই মুসলমানরা তাকিয়ে থাকুক। আর বাস্তবে সে সফলও হয়েছে বটে।
হে মুসলিম যুবক!
ফুটবলকে তুমি জীবনের চাইতেও গুরুত্বপূর্ণ বানিয়ে নিলে? তুমি কী একবারও ভাবোনি তুমি একজন মুসলিম? তুমি কী একবারও ভাবোনি, যে চোখ ছিল উম্মাহর অস্তিত্ব রক্ষার প্রহরী, সে চোখ আজ কাফের খেলোয়াড়দের পায়ের দিকে তাকিয়ে আছে?
যে হুঙ্কার ছিল কাফেরদের মসনদ ধূলিসাৎ করার, সে হুঙ্কার আজ কাফেরদের খেলার জয়ে প্রকম্পিত হয়। তুমি কী ভুলে গেলে নিজের আত্মপরিচয়? কিসে তোমাকে আজ ধোঁকায় ফেলে দিল? যে যমীনে রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া-সাল্লামের প্রতি সবচেয়ে বড় সম্মান দেখানোর প্রয়োজন ছিল, এবং পৃথিবীর সব প্রান্তে উঁচু হয়ে কালিমার পতাকা দাঁড়িয়ে থাকার কথা ছিল, কিন্তু আজ তুমি কাফেরদের পতাকা উঁচু করে তুলে ধরেছো।
তুমি কী উহুদ ও মু'তার যুদ্ধের ঐতিহাসিক বীরত্ব জানো না? উহুদের ময়দানে মুসআব ইবন উমায়ের (রাঃ) ইসলামের পতাকা সমুন্নত রাখতে, হাতের পর হাত কর্তিত হওয়ার পরও ক্ষান্ত হননি, বরং শাহাদাত বরণ করা পর্যন্ত ইসলামের পতাকাকে সমুন্নত রেখেছিলেন। তাহার পরে মু'তার যুদ্ধে কাফেরদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হন বীর যোদ্ধারা। এক অসম লড়াইয়ে পতাকা উঁচু করে তুলে ধরেন হযরত যায়েদ ইবন হারিসা (রাঃ)। তিনি শাহাদাত বরণ করলে তারপর পতাকা উঁচু করে তুলে ধরেন হযরত জাফর (রাঃ)। তিনিও শাহাদাত বরণ করলে তারপর পতাকা উঁচু করে তুলে ধরেন আব্দুল্লাহ ইবন রাওয়াহা (রাঃ) এবং তিনিও শহীদ হন। এরপর পতাকা তুলে ধরেন খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ (রাঃ)।
মুতার যুদ্ধের এই সংবাদ বর্ণনা করতে করতে রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া-সাল্লাম)-এর চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠেছিল। কারণ তাঁরা ছিলেন ইসলামের সেই বীর সন্তান, যারা নিজেদের জীবনকে তুচ্ছ করে আল্লাহর দ্বীনকে সমুন্নত রাখার জন্য ময়দানে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। তারা কাফেরদের বিপরীতে হক্বের পতাকাকে উঁচু করে তুলে ধরেছিলেন।
হায় আফসোস মুসলিম উম্মাহ! সাহাবায়ে কেরামের রক্তরঞ্জিত সেই পতাকা তুমি ভুলে গেলে? তারা যে কুফফারদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল, সেই কাফেরদের পতাকাকে তুমি সম্মানের শিখরে উঁচু করে তুলে ধরলে?
“হে মানুষ! তোমাকে কিসে তোমার মহান প্রতিপালক সম্বন্ধে বিভ্রান্ত করলো?”[২]
ফুটবল চাকচিক্য ও অসহায় উম্মাহ:
ফুটবল বিশ্বকাপ উন্মাদনায় তুমিও ভুলে গেলে ক্ষুধার্ত শিশুদের, যারা খাদ্যের অভাবে হাড্ডিসার হয়ে গেছে। ফুটবল স্টেডিয়ামের আলোকিত উল্লাসে তুমি ভুলে গেলে ফিলিস্তিনি শিশুদের? হাজার হাজার টন বোমা যখন গাজায় পড়ল, তখন এই কাফেররা ছিল নিশ্চুপ ও নীরব।
আজ তাদের জয়ে তুমিও উল্লাসিত হচ্ছো, তাদের পরাজয়ে তুমিও ব্যথিত হচ্ছো; অথচ গাজা গণহত্যায় কাফেররা ছিল উদাসীন। তুমি কিভাবে পারো এমনভাবে দেউলিয়া হয়ে যেতে?
তাদের এই রঙ্গমঞ্চে চলছে হাসি-তামাশা ও আনন্দ-উল্লাস। অথচ আরাকানে অসহায় নারী-শিশুদের কঙ্কাল মাটিতে পড়ে আছে, ইয়েমেনে খাদ্যের অভাবে শিশুরা মারা যাচ্ছে, সোমালিয়ায় দুর্ভিক্ষে মানুষ দিশেহারা। তুমি কিভাবে পারো এই রঙ্গমঞ্চে নিজেকে বিলীন করে দিতে?
ফুটবল বিশ্বকাপ যার জন্য উৎসর্গ হচ্ছে:
ফুটবল বিশ্বকাপ উন্মাদনায় তুমি যখন অন্ধ হয়ে আছো, খেলার জন্য অপর মুসলিম ভাইকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য, ঠাট্টা ও তিরস্কার করছো; অন্যদিকে তারা তোমাকে নির্বোধ বানিয়ে বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা করে নিল। তোমার আবেগ, উন্মাদনা, উল্লাস ও রেষারেষি-সবই তাদের কাছে ডলার আয় করার উপকরণ। ফুটবল বিশ্বকাপের প্রতিটি ইঞ্চি মাটি, প্রতিটি পয়সা, প্রতিটি সেকেন্ড যেন ইবলিসের জন্য উৎসর্গ হচ্ছে। পতিতা, সমকামী, মদ্যপায়ী, যেনাকারী ও খোদাদ্রোহী সমস্ত কুফফারের মিলনায়তনে পরিণত হয়েছে এটি। বিশ্বকাপের জন্য নির্মিত প্রমোদ তরী, চোখ ধাঁধানো স্টেডিয়াম, চাকচিক্যময় নগর সাজানো, বিলাসবহুল রিসোর্ট, নর্তকীপূর্ণ এরিয়া, অশ্লীলতার রণতরী এবং আখিরাত-বিমুখী মহা আনন্দ-উল্লাস দেখে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, ফুটবল বিশ্বকাপ যেন ইবলিসের লুকানো জান্নাত
হে যুবক!
ফুটবল ও খেলাধূলাকে কেন্দ্র করে তুমি যে মূল্যবান সময়, শক্তি, আবেগ ও অর্থ ব্যয় করছ, সেদিন মহান আল্লাহর সামনে এর প্রতিটি মুহূর্ত ও প্রতিটি ব্যয়ের হিসাব তোমাকে দিতে হবে। মোহে কাটানো প্রতিটি চোখের জবাব দিতে হবে। কুফফারদের নিয়ে আনন্দিত বা বিচলিত হওয়া প্রতিটি মুহূর্তের জবাব দিতে হবে। খোদাদ্রোহীদের আনন্দে-উল্লাসে তমিও আজ হারিয়ে যাচ্ছো; অথচ গাজা, ইয়েমেন, আন্দালুস, বুখারা, সমরকন্দ, মিন্দানাও, তুর্কিস্তান এখনো নিভৃতে কাঁদে।
মেসি-নেইমার-রোনালদো কী তাদের পরিচয়?
তুমি যাদের আইকন ও আইডল বানিয়ে নিয়েছো, তাদের সবচেয়ে বড় পরিচয় তারা-আল্লাহকে অস্বীকারকারী এবং রাসূল (সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া-সাল্লাম)-এর নবুয়ত অস্বীকারকারী। এটাই তাদের প্রকৃত পরিচয়। তাদের পরিচয় আল্লাহ তা‘আলা কুর‘আনে যেভাবে দিয়েছেন:
“নিশ্চয়ই যারা কুফরি করেছে এবং কাফের অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে, তাদের ওপর আল্লাহ, ফেরেশতাগণ এবং সমগ্র মানবজাতির লানত।”[৩] “আর যারা তাদের রবকে অস্বীকার করে, তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের আযাব। আর কতইনা নিকৃষ্ট সেই প্রত্যাবর্তনস্থল।”[৪] “দেশ-বিদেশে কাফিরদের অবাধ বিচরণ যেন তোমাকে কিছুতেই ধোঁকায় না ফেলে। এ তো সামান্য ভোগ মাত্র, তারপর তাদের আবাসন হবে জাহান্নাম, আর তা কতই না নিকৃষ্ট বিছানা!”[৫]
তাদের প্রতি মহব্বত করার পরিণতি:
একজন মুসলিম কখনো কাফিরের অনুসারী হতে পারে না। কখনো সে তাদেরকে ভালোবাসতে পারে না। কখনো সে কাফিরদের সাদৃশ্য গ্রহণ করতে পারে না এবং কখনো সে কাফিরদেরকে বন্ধুরুপে গ্রহণ করতে পারে না। আব্দুল্লাহ ইবন মাস‘উদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া-সাল্লাম) বলেছেন:
“মানুষ (কিয়ামতের দিন) তার সাথেই থাকবে, যাকে সে ভালোবাসে।”[৬]
তুমি যে কাফেরদের মহব্বত করছো, সে কী তোমাকে চেনে? হাশরের দিনে সে কী তোমার উপকারে আসবে? অথচ তুমি তোমার রাসূল সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া-সাল্লামকে চিনতে পারোনি, রাসূল সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া-সাল্লামকে মহব্বত করতে পারোনি। অথচ কাল হাশরে রাসূল সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতে থাকবেন- “ইয়া উম্মাতি, ইয়া উম্মাতি”। তিনি উম্মাহর চিন্তায় চিন্তিত থাকবেন, তিনি উম্মতের জন্য পেরেশানিতে থাকবেন। রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া-সাল্লাম) বলেছেন: “প্রত্যেক নবীর একটি (বিশেষ) দো‘আ রয়েছে। আমি আমার সে দো‘আটি কিয়ামতের দিন আমার উম্মতের শাফাআতের জন্য জমা বা লুকিয়ে রাখার ইচ্ছা করছি—ইন'শা-আল্লাহ।”[৭]
তিনি উম্মাহর জন্য কত দরদী! অথচ তুমি পোশাক ও চুলের কাটিং—সব কিছুতে কাফিরদের অনুকরণ করছো। এই অধঃপতন তোমার কিভাবে হলো? পোশাক-পরিচ্ছদ ও কথা-বার্তায় কাফেরদের সাদৃশ্য গ্রহণ করা যাবে না। কেননা পোশাক-পরিচ্ছদ, কথা-বার্তা ও অন্যান্য বিষয়ে কাফেরদের সাদৃশ্য গ্রহণ করা তাদেরকে ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ও প্রমাণ বহন করে। রাসূল (সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া-সাল্লাম) বলেছেন:
“যে ব্যক্তি কোন জাতির অনুসরণ করবে, সে উক্ত জাতির অন্তর্ভুক্ত হবে।”[৮] আরও এসেছে: “যে আমাদের ব্যতীত অন্যদের রীতিনীতির অনুসরণ করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।”[৯]
হে যুবক!
তুমি তোমার গায়ে কাফেরদের জার্সিটা আর স্থান দিয়ো না। তোমার চুলের কাটিং কখনো কাফেরদের মতো হতে পারে না। তুমি কখনো তাদের সাদৃশ্য গ্রহণ করতে পারো না। তুমি কী চাও তোমার হাশর ঐ কাফেরদের সাথে হোক? নাকি তুমি চাও তোমার হাশর হযরত মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে?
কাফিরদের সাথে শত্রুতা ও মু’মিনদের সাথে বন্ধুত্ব:
“নিশ্চয়ই মু’মিনগণ পরস্পর ভাই ভাই।”[১০]
একজন মুসলিম তো অপর মুসলিমের ভাই। আমাদের ভ্রাতৃত্বই তো আমাদের গৌরব। কিন্তু আজ কাফেরদের কারণে এক মুসলিম অপর মুসলিমের ভ্রাতৃঘাতী হয়ে উঠেছে। কাফেরদের প্রতি ভালোবাসা দেখাতে এক মুসলিম আরেক মুসলিমকে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করছে। অথচ মুসলমানদের মাঝে থাকা উচিত ছিল ‘ওয়ালা ওয়াল বারা’। মুসলমানদের ঈমানের দুটি মজবুত ভিত্তিই হলো আক্বীদাতুল ওয়ালা ওয়াল বারা।
আল ওয়ালা: আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং মু’মিনদের মনে-প্রাণে ভালোবাসা। তাদের সাহায্য করা এবং তাদের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করা। মু’মিন অপর মু’মিনের প্রতি মহব্বত ও ভালোবাসা প্রকাশ করবে। কখনো কথা দিয়ে তাকে কষ্ট বা আঘাত করবে না। রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া-সাল্লাম) বলেছেন: “মু’মিন সে ব্যক্তি, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্যান্য মুসলিম নিরাপদ থাকে।”[১১]
- ওয়াল বারা: কুফর, শিরক, আল্লাহর অবাধ্যতা এবং ইসলামের শত্রুদের থেকে সম্পূর্ণ সম্পর্কহীনতা বা অসন্তুষ্টি প্রকাশ করা। ইবাদত, সংস্কৃতি, পোশাক এবং ধর্মীয় রীতিনীতিতে অমুসলিমদের অন্ধ অনুকরণ না করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন: “আর তাদেরকে বর্জন করো, যারা নিজেদের দ্বীনকে ক্রীড়া ও কৌতুকরূপে গ্রহণ করেছে এবং পার্থিব জীবন যাদেরকে ধোঁকায় ফেলেছে।”[১২]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া-তা‘আলা সতর্ক করেছেন—
“মু’মিনগণ যেন মু’মিনগণ ব্যতীত কাফিরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করে। যে কেউ এরূপ করবে তার সাথে আল্লাহর কোনো সম্পর্ক থাকবে না। তবে ব্যতিক্রম, যদি তোমরা তাদের নিকট হতে আত্মরক্ষার জন্য সতর্কতা অবলম্বন কর।”[১৩]
ফুটবল বিশ্বকাপ ও উগ্র জাতীয়তাবাদ:
যুবক, তুমি কখনো কাফেরদের খেলার জন্য অপর ভাইয়ের প্রতি বিভক্ত হতে পারো না। এক কাফের দেশের সাপোর্টের জন্য অন্যকে ঘৃণা করতে পারো না। কাফেরদের জন্য তোমার এই শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই হলো জাহেলিয়াত। তুমি এই জাতীয়তাবাদের কারণে নিজ মুসলিম ভাইকে শত্রু মনে করছো, আর আরেক কাফেরকে আপন মনে করছো। দুর্ভাগ্য তোমার জন্য! যে জাতীয়তাবাদ নামক জাহেলিয়াতকে রাসূল সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া-সাল্লাম কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছেন, তুমি সেই জাতীয়তাবাদকে উদযাপন করছো! রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া-সাল্লাম) বলেছেন:
“যে ব্যক্তি অন্ধ পতাকার নিচে যুদ্ধ করল, কিংবা উগ্র জাতীয়তাবাদের (আছাবিয়্যাহ) দিকে আহ্বান জানাল, অথবা উগ্র জাতীয়তাবাদের কারণে রাগান্বিত হলো এবং এই অবস্থায় মারা গেল—তার মৃত্যু হবে জাহেলিয়াতের (কুফর ও অজ্ঞতার) মৃত্যু।”[১৪] “সে আমাদের দলভুক্ত নয়, যে আসাবিয়তের দিকে আহ্বান করে, আসাবিয়তের জন্য যুদ্ধ করে বা আসাবিয়তের ওপর মৃত্যুবরণ করে।”[১৫] আরও এসেছে: “এটি (আসাবিয়্যাহ) ছেড়ে দাও; কারণ এটি দুর্গন্ধযুক্ত।”[১৬]
হযরত উবাই ইবন কাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া-সাল্লাম ইরশাদ করেছেন–
“আমি এই কথা বলতে লজ্জাবোধ করি না, যারা আসাবিয়তের দিকে ডাকলো, আসাবিয়তকে আঁকড়ে ধরলো, তারা যেন নিজ পিতৃলিঙ্গ কামড়ে ধরলো।”[১৭]
হে যুবক, তোমার বাড়ির আঙিনা থেকে কাফেরদের জাতীয়তাবাদের পতাকাগুলো উপড়ে ফেলে দাও। তোমার গায়ে কাফেরদের জার্সিগুলো ছিঁড়ে ফেলে দাও। তোমার দেয়ালে কাফেরদের জাতীয়তাবাদের পতাকার রঙগুলো কালি দিয়ে মুছে দাও।
আফসোস উম্মাহর জন্য:
আসলে আজকে মুসলমান কার ইবাদত করছে-আল্লাহর নাকি প্রবৃত্তির? একটি মাত্র স্টেডিয়ামে একটি মাত্র খেলা চলছে, কোটি কোটি দর্শক উপভোগ করছে। অথচ লাখ লাখ মসজিদে লাখ লাখ বার আযান হচ্ছে, আল্লাহর জন্য ডাকা হচ্ছে, কয়জন আসে মসজিদে? এজন্যই আল্লাহ বলেছেন হিসাব গ্রহণের সময় ক্রমশ ফুরিয়ে আসছে, অথচ মানুষ আজ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।
“মানুষের হিসাব-নিকাশের সময় ঘনিয়ে এসেছে, অথচ তারা গাফিলতিতে মুখ ফিরিয়ে রয়েছে। তাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে যখনই নতুন কোনো উপদেশ আসে, তারা তা শোনে, কিন্তু খেল-তামাশায় মত্ত থাকে।”[১৮]
তুমি কী ফিরবে ফুটবল আফিম থেকে?
তুমি হয়তো এতক্ষণে উপরের সব লেখাগুলো পড়েছো। তুমি একজন সৌভাগ্যবান যে উম্মতে মুহাম্মাদী হতে পেরেছো। তোমার চিন্তা-বিশ্বাস, আচার-আচরণ, আখলাক ও পোশাক-পরিচ্ছদ কখনো কাফিরদের অনুরূপ হতে পারে না।
তোমার বিবেকের সবুজ সতেজ আঙিনায় চাষাবাদ হোক সুস্থ মনের। আমি জানি তুমি আজ থেকেই পরিহার করবে ফুটবল নামক এক অসুস্থ উন্মাদনা । অবশ্যই তুমি পারবে খেলা নামক এই আফিমের নেশা থেকে বেরিয়ে আসতে। কারণ তুমি চিন্তা ও ভাবনায় আশরাফুল মাখলুকাত।
তুমি তো- উমর ইবন খাত্তাব (রাঃ), হামজা ইবন আব্দুল-মুত্তালিব (রাঃ), আলি ইবন আবি-তালিব (রাঃ), খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ (রাঃ), উসামা বিন যায়েদ (রাঃ), সুলতান মুহাম্মদ বিন কাসিম (রাহি.), সুলতান সালাউদ্দীন আইয়ুবী (রাহি.), সুলতান মুহাম্মদ আল-ফাতিহ (রাহি.), সুলতান মাহমুদ গাযনবি (রাহি.), তারিক বিন যিয়াদ (রাহি.), খলিফা আল-মু'তাসিম বিল্লাহ (রাহি.), সৈয়দ তিতুমীর (রাহি.) এবং আশরাফ আলী থানবি (রাহি.)-এর উত্তরসূরী, যাদের মস্তিষ্ক ছিল স্বাধীনচেতা—তুমি কখনো খেলাধুলার নামে কাফেরদের দাসে পরিণত হতে পারো না। তোমার এই মস্তিষ্ক কখনো নোংরা খেলার উন্মাদনার খাঁচায় বন্দি হতে পারে না।
আমরা তো সেই বীর জাতি,
যার হাতে ছিল কালজয়ী তরবারি;
যে হাত পালটে দিয়েছে ইতিহাস ও সভ্যতা।
সে হাতে আজ দখল নিয়েছে
ভিনদেশী কাফেরের পতাকা।
আমরা তো ছিলাম সেই জাতি,
যার চোখ ছিল খেলাফতের অনুসন্ধানী সীমানায়;
কিন্তু সেই চোখ আজ তাকিয়ে আছে
কাফেরদের পায়ের আঙিনায়!
যে বুকে ছিল উদারতার শীতল শস্যখনি,
যে বুকে ছিল উম্মাহর বিজয়ের শিরোমণি,
সে বুকে আজ তপ্ত হিংসার নির্মম ধ্বনি।
পোশাক-পরিচ্ছদে কাফেরদের দলভুক্ত হইয়ো না। নিচু কাপুরুষের মতো কাফেরদের পতাকা উঁচু করার জন্য তোমার জন্ম হয়নি। তুমি তাদেরকে সমর্থন দিতে পারো না, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অস্বীকার করেছে এবং যাদের প্রত্যাবর্তনস্থল জাহান্নাম।
“বলুন, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়োনা। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেন। নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”[১৯]
পরিশেষে:
কাফেরদের মনমাতানো এই রঙ্গলীলা তথা বিশ্বকাপ আয়োজন আসলে ফুটবলকে লাতি মারার জন্য না, বরং এটি তোমার ঈমান, তাক্বওয়া ও চিন্তাশীল মাথাকে সজোরে লাতি মারার জন্য। অতএব, ফিরে এসো হে যুবক, ফিরে এসো! ফিরে এসো আমার ভাই ফিরে এসো! ফিরে এসো হে উম্মাহর বীর, ফিরে এসো!
“দুনিয়ার জীবন নিছক খেল-তামাশা ছাড়া আর কিছুই না। যারা তাক্বওয়া অবলম্বন করে তাদের জন্য পরকালের জীবনই অতি কল্যাণময়।”[২০] জেনে রাখো: “যালিমরা একে অপরের বন্ধু; আর আল্লাহ মুত্তাক্বীদের বন্ধু।”[২১]
হে মহান আল্লাহ! আমাদেরকে সকল প্রকার গাফিলতি, অন্ধ অনুসরণ-অনুকরণ ও জামানার ফিতনা থেকে হেফাযত করুন। আমীন।
জাযাকাল্লাহু খাইরান। বারাকাল্লাহু ফীক।
❏ ফুটনোট:
[১]~(সূরা আল-ইমরান: আয়াত ২৮)
[২]~(সূরা আল-ইনফিত্বার: আয়াত ০৬)
[৩]~(সূরা আল-বাক্বারাহ: আয়াত ১৬১)
[৪]~(সূরা আল-মূলক্: আয়াত ০৬)
[৫]~(সূরা আল-ইমরান: আয়াত ১৯৬-১৯৭)
[৬]~(সহিহ বুখারী: ৬১৭১, সহিহ মুসলিম: ২৬৩৯, আহমাদ: ১২০৭৬)
[৭]~(সহিহ বুখারী: ৬১৬৮)
[৮]~(সুনান আবূ দাউদ: ৪০৩১)
[৯]~(সুনানুল বায়হাকি: ৯/২৩৪)
[১০]~(সূরা আল-হুজুরাত: আয়াত ১০)
[১১]~(সহিহ মুসলিম: ৪০)
[১২]~(সূরা আল-আন‘আম: আয়াত ৭০)
[১৩]~(সূরা আল-ইমরান: আয়াত ২৮)
[১৪]~(সহিহ মুসলিম: ১৮৪৮, সুনান আন-নাসাঈ: ৪১১৫, ইবনু মাজাহ: ৩৯৪৮, আহমাদ: ৭৮৮৪)
[১৫]~(সুনান আবূ দাউদ: ৫১২১)
[১৬]~(সহিহ বুখারী: ৪৯০৫, সহিহ মুসলিম)
[১৭]~(আহমাদ: ২১২৩৬, নাসাঈ কুবরা: ১০৮১০, ত্বাবারানী: ৫৩২, সহীহুল জামে: হা/৫৬৭)
[১৮]~(সূরা আল-আম্বিয়া: আয়াত ১-২)
[১৯]~(সূরা আয-যুমার: আয়াত ৫৩)
[২০]~(সূরা আল-আন‘আম: আয়াত ৩২)
[২১]~(সূরা আল-জাসিয়াহ: আয়াত ১৯)